কিছু ঠিকানা কখনো পুরোনো হয় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবনের মানচিত্র বদলে যায়, কর্মক্ষেত্র বদলে যায়, শহর বদলে যায়, মানুষ বদলে যায়—কিন্তু হৃদয়ের ভেতরে একটি ঠিকানা চিরকাল একই রয়ে যায়। আমার কাছে সেই ঠিকানার নাম—সরকারি স্বরূপকাঠি পাইলট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
আজ যখন বহু বছর পর স্মৃতির জানালাটি খুলে বসি, তখন মনে হয় যেন আবার সেই সকালের ঘণ্টাধ্বনি কানে ভেসে আসছে। কুয়াশা ভেজা সকাল, কাঁধে বইয়ের ব্যাগ, তাড়াহুড়ো করে বিদ্যালয়ের ফটক পেরিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়া—কী অপূর্ব ছিল সেই দিনগুলো! তখন বুঝিনি, জীবনের সবচেয়ে নির্মল, সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো নীরবে আমাদের হাতের মুঠো থেকে ভবিষ্যতের স্মৃতিতে রূপ নিচ্ছিল।
সেই শ্রেণিকক্ষগুলো আজও কি আগের মতোই রোদে আলোকিত হয়? সেই বেঞ্চগুলো কি এখনও নতুন স্বপ্ন বুকে নিয়ে বসে থাকা শিক্ষার্থীদের গল্প শোনে? হয়তো দেয়ালগুলো নীরব, কিন্তু তারা জানে কত হাসি, কত কান্না, কত দুষ্টুমি, কত প্রতিজ্ঞা আর কত অদেখা স্বপ্নের সাক্ষী হয়ে আছে তারা।
আমাদের প্রিয় শিক্ষকরা শুধু বইয়ের পাঠ শেখাননি। তাঁরা শিখিয়েছিলেন কীভাবে একজন ভালো মানুষ হতে হয়। সততা কী, দায়িত্ব কী, শৃঙ্খলা কী, মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা কী—এসবের প্রথম পাঠ আমরা পেয়েছিলাম তাঁদের কাছ থেকেই। জীবনের বহু কঠিন সিদ্ধান্তের মুহূর্তে আজও মনে পড়ে যায় কোনো এক শিক্ষকের সহজ অথচ গভীর উপদেশ। তখন উপলব্ধি করি, বিদ্যালয়ের প্রকৃত শিক্ষা পরীক্ষার খাতায় শেষ হয়ে যায় না; তা সারাজীবন মানুষকে পথ দেখায়।
বন্ধুত্বের কথাও ভুলে থাকা যায় না। টিফিন ভাগাভাগি করে খাওয়া, পরীক্ষার আগের রাতে একে অপরকে পড়ানো, খেলার মাঠে হেরে গিয়েও একসঙ্গে হাসা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মহড়া, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার উত্তেজনা—এসবই তো আমাদের কৈশোরের অমূল্য সম্পদ। আজ সবাই পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছি, কিন্তু সেই বন্ধুত্বের শিকড় এখনও এই বিদ্যালয়ের মাটিতেই গাঁথা।
১৯২৭ সালে যে বিদ্যাপীঠের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার শতবর্ষ পূর্তি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের বয়সের হিসাব নয়; এটি একটি জনপদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ এবং মানুষের সম্মিলিত ইতিহাসের এক গৌরবগাথা। একশো বছরের এই অভিযাত্রায় অসংখ্য শিক্ষক তাঁদের প্রজ্ঞা দিয়ে, অসংখ্য শিক্ষার্থী তাঁদের স্বপ্ন দিয়ে এবং অসংখ্য অভিভাবক তাঁদের বিশ্বাস দিয়ে এই প্রতিষ্ঠানকে সমৃদ্ধ করেছেন। আজকের এই গৌরব তাঁদের সবার।
শতবর্ষ মানে কেবল অতীতের দিকে ফিরে তাকানো নয়; এটি আগামী দিনের প্রতিশ্রুতিও। নতুন প্রজন্ম যেন এই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বহন করে আরও অনেক দূর এগিয়ে যায়—এই প্রত্যাশাই আমাদের।
আজ যদি আবার একবার বিদ্যালয়ের সেই চেনা পথে হাঁটার সুযোগ পেতাম, হয়তো ধীরে ধীরে প্রতিটি শ্রেণিকক্ষের সামনে দাঁড়াতাম। নীরবে ছুঁয়ে দেখতাম সেই দেয়ালগুলোকে, যেখানে আমাদের কৈশোরের দিনগুলো এখনও অদৃশ্য অক্ষরে লেখা আছে। হয়তো মাঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করলেই শুনতে পেতাম বন্ধুদের হাসি, শিক্ষকদের ডাক, আর সকালের সমাবেশে জাতীয় সংগীতের সেই পরিচিত সুর।
জীবন আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে—কর্মজীবন, সাফল্য, পরিচিতি, দায়িত্ব। কিন্তু মানুষ হিসেবে আমাদের প্রথম পরিচয় গড়ে দিয়েছিল যে প্রতিষ্ঠান, তার কাছে আমাদের ঋণ কোনোদিন শোধ হওয়ার নয়।
আজ গর্বের সঙ্গে বলি—আমি এই বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী ছিলাম। এই পরিচয় আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্মান।
শতবর্ষের এই মাহেন্দ্রক্ষণে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই প্রতিষ্ঠাতা, সকল প্রয়াত ও জীবিত শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, অভিভাবক এবং প্রতিটি শিক্ষার্থীকে, যাঁদের ভালোবাসা ও ত্যাগে গড়ে উঠেছে এই গৌরবময় প্রতিষ্ঠান।
সরকারি স্বরূপকাঠি পাইলট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় শুধু একটি বিদ্যালয় নয়—এটি আমাদের শিকড়, আমাদের স্মৃতি, আমাদের অহংকার, আমাদের আত্মপরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
শুভ শতবর্ষ।
আরও শত বছর জ্বলে থাকুক জ্ঞানের এই অমলিন প্রদীপ।
“যেখানে শিকড়, সেখানেই ফিরে যেতে ইচ্ছে করে”
কিছু ঠিকানা কখনো পুরোনো হয় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবনের মানচিত্র বদলে যায়, কর্মক্ষেত্র বদলে যায়, শহর বদলে যায়, মানুষ বদলে যায়—কিন্তু হৃদয়ের ভেতরে একটি ঠিকানা চিরকাল একই রয়ে যায়।…